কোটি কোটি প্রদীপের আলোও তমসাচ্ছন্ন আকাশ ঢাকতে অক্ষম

কোটি কোটি প্রদীপ ব্যর্থ তমসাচ্ছন্ন আকাশ ঢাকতেঃ


মোমবাতি ও আতসবাজির রোশনাই কতটুকু হাজার হাজার অভিবাসী শ্রমিকের মিছিল আলোকিত করলো তার উত্তর অজানা। যদি তার কয়েক ফোটা আলো শিশিরকণার মতো সেই তিন - চারশো মাইলব্যাপী মিছিলের উপর ঝরে পড়তো, হয়তো তাহলে আমরা এমন বিভীৎস্য আনন্দ যজ্ঞে মেতে উঠতাম না। দিল্লির রেস্তোরাঁতে কর্মরত রণবীর সিংহকে ৩০০ কিমি পায়ে হেঁটে বাড়ি ফেরার পথে ক্লান্তি ও অবসাদে আচ্ছন্ন হয়ে লুটিয়ে পড়তে হত না। এই মুহূর্তে খুব জানতে ইচ্ছে করছে সেইসব দিন আনি দিন খাই খেটে খাওয়া মানুষদের কথা। তারা কি উল্লাসিত হয়ে মোমবাতি জ্বালানোর আনন্দ যজ্ঞে মেতে উঠেছিল? সম্ভবত না। সেই লক্ষ লক্ষ মানুষের হয়তো 'মন কি বাত' শুনে দেশপ্রেম জাহির করার অবসরটুকু নেই। অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর মূল শ্রোতা রামভক্তদের কানে তা ঠিক পৌঁছে যাচ্ছে। অতঃপর ভক্তগণ প্রসন্নচিত্তে সেইসব উপদেশ সোৎসাহে পালন করেছেন।

আমাদের দেশের প্রায় নব্বই শতাংশ মানুষের বাধা মাইনের চাকরি নেই। আবার শহরে ৩৫ - ৪০ শতাংশ গরিবের বাস। এদের বেশিরভাগ লোকজনের বাস বস্তি এলাকায়। এদের 'ওয়ার্ক ফ্রম হোমের' সুযোগ নেই। ফলে মাসের শেষে বাড়িতে বসেই ব্যাঙ্ক আকাউন্টে মাইনে ঢুকে যাবে আর তারা নেটফ্লিক্স ও হাজার রকমের 'ঝুঁকিপন্ন' চ্যালেঞ্জ লুফে নিয়ে ফেসবুকে পোস্টাবে; সেই বিলাসিতা নেই। এখন দিন আনি দিন খাই মানুষের একমাত্র চ্যালেঞ্জ শুধুমাত্র বেঁচে থাকায়! একজন উচ্চবিত্ত - মধ্যবিত্তের করোনা ডায়রির থেকে একজন গরিবের করোনা ডায়রি; সম্পূর্ণ পৃথক।বস্তিগুলোতে গায়ে গায়ে ঘেঁষে আট বাই আট ফুটের ঘর, মাঝে খোলা নর্দমা, বারোয়ারি স্নানাগার ও শৌচালয়। এখানেই বাস শহরের রিকশা চালক, মেকানিক,আমাদের বাড়ির পরিচারিক - পরিচারিকাদের। এক একটা ঘরে কম করে তিন - পাঁচজনের বাস। এরা হয়তো দিনের বেশির ভাগ সময় বাড়ির বাইরে কাটায়। রাতে যা শুতে আসে ঘরে। এই অস্বাস্থ্যকর পরিস্থিতিতে ওইটুকু ঘরে দিনের পর দিন বন্দি থাকা কি সম্ভব? আর যদি তাও থাকে, সরকারের সাহায্যে কতদিন তাদের চলবে; নিজেরাই একবার ভেবে দেখুন। জানি নিজের নিশ্চিত ফ্ল্যাটে থেকে সেই অবস্থার আন্দাজ করা অসম্ভব। তবুও একবার চেষ্টা করে দেখুন, হয়তো পারবেন।

অবশ্য গরিবগুর্বো চালচুলোহীন মানুষের কথা কেই বা কবে ভেবেছে! যদি ভাবতো হাজার হাজার কর্মহীন, আয়হীন শ্রমিকদের বাড়ি ফিরে আসার ঘটনাকে কোল্যাটারাল ড্যামেজ ঠাওরাত না। এভাবে দীর্ঘদিন কর্মহীন, আয়হীন অবস্থায় নিজেদের বাড়ি ছেড়ে বেশিদিন বসে থাকা যায়না। এদিকে মানুষের রেশন কার্ড থেকে ব্যাঙ্কের জনধনের খাতা গ্রামেই। সরকারের দেওয়া সাহায্য রাজ্যের বাইরে পাওয়া যাবেনা। এক্ষেত্রে সরকার বিচক্ষণ ও পরিকল্পনা করে লোকডাউন ঘোষণা করলে এই মানুষগুলোর মাথায় এভাবে বিপর্যয় নেমে আসত না। সীমিত সঞ্চয় নিয়ে ভিনরাজ্যে জীবনধারণ করা যে অসম্ভব, তা বোঝার ক্ষমতা আমাদের লোপ পেয়েছে। নাগরিক মর্যাদার এই অপমান কি করে আমাদের নির্লিপ্ত রাখতে পারে জানা নেই। অবশ্য যে দেশে বছরে প্রায় সত্তর- আশি লাখ মানুষ মারা যান, সেখানে কোভিদ - ১৯ হয়ে মারা যাওয়া মানুষের সংখ্যা তুলনামূলক ভাবে কিছুই নয়। একবার এই বস্তিগুলোতে করোনার সংক্রমণ যে কি ভয়াভহ আকার ধারণ করতে পারে তা ভাবলেও শিউরে উঠতে হয়। অথচ যে বিশ্বায়িত পুঁজিবাদী পৃথিবীর কারণে গোটা বিশ্বে করোনা ছড়িয়ে পড়ল, গরিবরা তার সুযোগ সুবিধার ভাগিদার নন।

অর্থব্যবস্থায় বৃদ্ধির জন্য পুঁজি ও শ্রমের গতিময়তা আবশ্যিক। বাজারে পুঁজির বিনিয়োগের সাথে সাথে কলকারখানায় শ্রমিকদের শ্রম প্রদান অর্থব্যবস্থা সচল রাখে ও বৃদ্ধি ঘটায়। কিন্তু করোনার প্রভাবে শ্রমিকেরা কাজে যোগদান করতে পারছে না। ফলে অর্থব্যবস্থা থমকে গেছে। এই অবস্থা থেকে আমাদের মুক্তি কবে উত্তর অজানা। কিন্তু এই লকডাউন উঠে গেলে আমরা যে ২০০৮ সালের থেকেও গভীর সংকটের সম্মুখীন হতে চলেছি তা শুধু সময়ের অপেক্ষা।

করোনার লড়াইয়ে স্বাস্থ্যকর্মী, চিকিৎসকের এককাট্টাভাবে পাশে থাকার অঙ্গীকারস্বরূপ আমরা আকাশে আতসবাজির উৎসবের সাক্ষী। অথচ সেই চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মীরা ঠিক কোন পরিস্থিতিতে করোনা মোকাবিলা করছে সেই খবর কি আমরা রাখার চেষ্টা করি? দিল্লীশ্বররা চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষার ঠিকঠাক বন্দোবস্তটুকুও করে উঠতে পারেনি। এইসব কর্মীদের জন্য পার্সোনাল প্রটেকশন ইকুইপমেন্ট (PPE) যথেষ্ট পরিমানে জোগাড় করে উঠতে পারেনি এখনো। WHO এর আগে ফি হপ্তাহে সরকারকে সতর্ক করে এসেছে। এই সেদিন, ১৩ই মার্চ সরকার বিবৃতি দিয়েছে কোরোনাকে গুরুত্ব প্রদানের প্রয়োজন নেই। সরকার যে এই ব্যাপারে যথেষ্ট তৎপরতার পরিচয় দেয়নি সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। অথচ যে ব্যবস্থা করা সবচেয়ে জরুরি ছিল সেখান থেকে নজর ঘুরিয়ে থালা পেটানো, মোমবাতি জ্বালানোর বার্তা দেওয়া হচ্ছে। সত্যি আশ্চর্য্য হতে হয়!

লকডাউনের পরে ১.৭ লক্ষ্য কোটি টাকার একটা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। যার মূল্য দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের মাত্র ০.৮ শতাংশ। যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জিডিপির ১০ শতাংশ বরাদ্দ করেছে এই সংকটের মোকাবিলা করার জন্য। এদিকে আমাদের সরকারের প্যাকেজের অনেকটাই ছিল পূর্বনির্ধারিত। যেমন ১০০ দিনের কাজের মজুরি বৃদ্ধি বা কৃষকদের ব্যাঙ্কে ২০০০ টাকা প্রদান। ইতিমধ্যে সরকারি গুদামে ৭.৫ কোটি টন খাদ্যশস্য মজুদ আছে গরিব মানুষকে দেয়ার জন্য।

সত্যিই যদি দেশের প্রতি ভালোবাসা থাকে, তাহলে দাবি জানান পরের বাজেটে সরকার যেন জিডিপির অন্তত ৩ শতাংশ স্বাস্থ্য পরিষেবায় খরচ করবে। জেলায় জেলায় যেন সরকারি হাসপাতাল গড়ে তোলে। ২০১৯ - '২০ সালে ভারতের মোট সম্পদের পরিমান ১২.৬ লক্ষ কোটি ডলার (ক্রেডিট সুইসের হিসেবে)। যা ভারতীয় মুদ্রায় ৮০২ লক্ষ কোটি টাকা। এর মধ্যে নাকি ৭৫ শতাংশ অর্থাৎ ৬৬১ লক্ষ কোটি টাকা রয়েছে ধনীতম মাত্র ১০ শতাংশ ব্যক্তির কাছে। এদের উপরে যদি ১.৫ শতাংশ সম্পদ কর বসানো হয় তাহলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য কাঙ্খিত অর্থ সহজেই পাওয়া যাবে। সরকার যদি সেই ব্যবস্থা করে তাহলে সমগ্র ভারতবাসী উপকৃত হবেন।

অন্যথায় আমরা যে দ্রুত গতিতে কুসংস্কারাচ্ছন্ন বিজ্ঞানবিরোধী দক্ষিনপন্থি পপুলিস্ট রাজনীতির পালে হওয়া দিয়ে এগিয়ে চলেছি তাতে কোনদিন আমাদের ভরাডুবি না হয়! যে হাওয়া এখন দেশে বইছে, তার একটা অঙ্গ হল বিজ্ঞান বিরোধিতা ও বিশেষজ্ঞদের সম্পর্কে সন্দেহ, অনাস্থা ও প্রতক্ষ বিরোধিতা। হোয়াটস্যাপ বিশ্ববিদ্যালয়, আইটি সেলের ভুয়ো খবরের বলে বিশেষজ্ঞদের তুড়ি মেরে উড়িয়ে সবাই নিজেরাই বিশারদ হয়ে উঠছেন। কিন্তু আজ সংকটের দিনে আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখাচ্ছে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও বিশেষজ্ঞদের অবশ্য প্রয়োজনীয়তা। যার সামনে কোটি কোটি প্রদীপের আলোও তমসাচ্ছন্ন আকাশ ঢাকতে অক্ষম।

( তথ্যসূত্রঃ বিগত প্রায় ৭-৮ দিনে আনন্দবাজার সম্পাদকীয়তে প্রকাশিত লেখা থেকে প্রাপ্ত )

Comments